নিজস্ব প্রতিবেদক
২০২৬ সালের উচ্চমাধ্যমিক (এইচএসসি) ও সমমানের পরীক্ষার ফলে বড় ধরনের বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। ১১টি শিক্ষা বোর্ডে এবার পাসের হার ৫২ দশমিক ১২ শতাংশ, যা গত ২২ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। পরীক্ষায় অংশ নেওয়া ১২ লাখ ৪০ হাজার ৭৯৮ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছেন ৬ লাখ ৪৬ হাজার ৬৮৫ জন। অকৃতকার্য হয়েছেন ৫ লাখ ৯৪ হাজার ১১৩ জন, যা মোট পরীক্ষার্থীর ৪৭ দশমিক ৮৮ শতাংশ।
ফলাফলে পাসের হার কমার পাশাপাশি জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যাও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ২০২৫ সালে ৬৯ হাজার ৯৭ জন শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেলেও এবার পেয়েছেন ৪০ হাজার ৮৪ জন। অর্থাৎ এক বছরে জিপিএ-৫ কমেছে ২৯ হাজার ১৩টি, প্রায় ৪২ শতাংশ। গত বছর পাসের হার ছিল ৫৮ দশমিক ৮৩ শতাংশ। সে হিসাবে এবার পাসের হার কমেছে ৬ দশমিক ৭১ শতাংশ।
এবার ইংরেজি ও তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বিষয়েই অকৃতকার্য হয়েছেন ৩ লাখ ৮২ হাজার ২১ জন। এর মধ্যে ইংরেজিতে ফেল করেছেন ২ লাখ ৪৩ হাজার ৫২৮ জন এবং আইসিটিতে ১ লাখ ৩৮ হাজার ৪৯৩ জন। অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের আগামী এক থেকে দুই মাসের মধ্যে পুনরায় পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী।
শিক্ষা সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, পূর্ণাঙ্গ সিলেবাসে পরীক্ষা হওয়ায় শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতির জন্য বাড়তি সময় ও পরিশ্রম দিতে হয়েছে। বড় সিলেবাস অনেকের মধ্যে মানসিক চাপও তৈরি করেছে। পাশাপাশি সব বোর্ডে অভিন্ন ও মানসম্মত প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা, খাতা মূল্যায়নে নিয়মের কঠোর অনুসরণ এবং পরীক্ষা কেন্দ্রে নজরদারি ও শৃঙ্খলা বজায় রাখার বিষয়গুলো ফলাফলে প্রভাব ফেলেছে বলে মনে করছেন তারা।
বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিবেশও ফল বিপর্যয়ের অন্যতম কারণ হতে পারে। ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর শিক্ষার্থীরা কলেজে ভর্তি হন। ওই সময় বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতার কারণে অনেক শিক্ষার্থী কলেজবিমুখ হয়ে পড়েন। নিয়মিত ক্লাসে উপস্থিতি ও পড়াশোনায় মনোযোগ কমে যাওয়ার প্রভাব এবারের ফলাফলে পড়েছে বলে তাদের ধারণা।
বোর্ডভিত্তিক ফল
ঢাকা বোর্ড: এবার ঢাকা বোর্ডে পাসের হার ৬১ দশমিক ৮০ শতাংশ। গত বছর এ হার ছিল ৬৪ দশমিক ৬২ শতাংশ। ফলে এক বছরে পাসের হার কমেছে ২ দশমিক ৮২ শতাংশ।
চট্টগ্রাম বোর্ড: গত ১৫ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পাসের হার দেখেছে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ড। এবার পাসের হার ৫২ দশমিক ৭ শতাংশ। গত বছর ছিল ৫২ দশমিক ৫৭ শতাংশ। এ বছর জিপিএ-৫ পেয়েছেন ২ হাজার ৯২৯ জন শিক্ষার্থী। গত বছরের তুলনায় জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমেছে ৩ হাজার ২০১ জন।
রাজশাহী বোর্ড: রাজশাহী বোর্ডে এবার পাসের হার ৪৫ দশমিক ০৬ শতাংশে নেমেছে। করোনা মহামারির সময় ২০২০ সালে অটোপাসের পর এবারই পাসের হার সর্বনিম্ন। বোর্ডের ১ লাখ ৩৭ হাজার ৩৫৬ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছেন ৬১ হাজার ৮৯৪ জন। পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক ইফফাত জেরীন বলেন, শিক্ষার্থীরা খাতায় যা লিখেছে, সে অনুযায়ী নম্বর পেয়েছে; কাউকে বাড়তি নম্বর দেওয়া হয়নি।
বরিশাল বোর্ড: বরিশাল শিক্ষা বোর্ডে পাসের হার ৪৪ দশমিক ৮৪ শতাংশ। জিপিএ-৫ পেয়েছেন ৯৫০ জন। গত বছরের তুলনায় পাসের হার ও জিপিএ-৫—দুটিই কমেছে। এ বোর্ডের ১১টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কোনো শিক্ষার্থীই পাস করতে পারেননি। পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক শরীফ মোর্শেদ রেজা জানান, যথাযথ পর্যালোচনা ও মূল্যায়নের মাধ্যমে ফল প্রকাশ করা হয়েছে।
মানবিক বিভাগে অকৃতকার্য বেশি
১১টি শিক্ষা বোর্ডে সামগ্রিক পাসের হার ৫২ দশমিক ১২ শতাংশ হলেও ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, মানবিক বিভাগে পাসের হার ৪২ দশমিক ১৭ শতাংশ। এ বিভাগে ২ লাখ ৫৮ হাজার ৯৩২ জন ছাত্রের মধ্যে পাস করেছেন ৯০ হাজার ৬৬৪ জন। আর ৩ লাখ ৪৮ হাজার ৮০৩ জন ছাত্রীর মধ্যে পাস করেছেন ১ লাখ ৬৫ হাজার ৬৪৭ জন। ফলে মানবিক বিভাগেই অকৃতকার্য শিক্ষার্থীর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি।
