Skip to main content

৯৭ শতাংশ কাজ শেষ, এরপরও বিআরটি বাতিলের সিদ্ধান্ত

�
• 4 min • 21 views

নিজস্ব প্রতিবেদক

ঢাকা থেকে গাজীপুর পর্যন্ত যানজট কমিয়ে দ্রুতগতির গণপরিবহণ চালুর লক্ষ্যে নেওয়া বাস র‌্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) প্রকল্প শেষ পর্যন্ত বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। প্রায় ৯৭ শতাংশ অবকাঠামো নির্মাণ শেষ হওয়ার পর গত ১৮ অক্টোবর প্রকল্পটি বাতিল করে নির্মিত অবকাঠামো সরিয়ে সড়কটিকে ছয় লেনের মহাসড়কে রূপান্তরের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এতে একদিকে যেমন দীর্ঘদিনের প্রত্যাশিত গণপরিবহণসেবা চালু হচ্ছে না, অন্যদিকে অবকাঠামো অপসারণ ও সড়ক সম্প্রসারণে নতুন করে অর্থ ব্যয়ের প্রয়োজন হচ্ছে।

প্রকল্পের আওতায় নির্মিত ২৫টি স্টেশন ও লেন বিভাজক অপসারণে ব্যয় ধরা হয়েছে ৪৫ কোটি টাকা। পাশাপাশি সড়কটি প্রশস্ত করার জন্য আরও ২৭ কোটি টাকা ব্যয়ের পরিকল্পনা রয়েছে। ফলে দীর্ঘ ১৪ বছরের নির্মাণযজ্ঞের পরও প্রকল্পটির কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

বিআরটি বা বাস র‌্যাপিড ট্রানজিট কেবল একটি পরিবহণব্যবস্থা নয়; নগর পরিকল্পনাবিদদের দৃষ্টিতে এটি শহরের পুনরুজ্জীবন, ভূমির কার্যকর ব্যবহার এবং সামাজিক, অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত উন্নয়নেরও একটি মাধ্যম। দ্রুত বর্ধনশীল, ঘনবসতিপূর্ণ ও তুলনামূলক কম আয়ের শহরগুলোর জন্য এ ব্যবস্থাকে সম্ভাবনাময় মনে করা হয়। নির্দিষ্ট লেনে দ্রুত বাস চলাচলের পাশাপাশি যাত্রী ওঠানামার আধুনিক ব্যবস্থা ও গণপরিবহণকেন্দ্রিক নগর পরিকল্পনা এর গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য।

বাংলাদেশে যানজট এড়িয়ে সড়কপথে গণপরিবহণের গতি বাড়ানোর উদ্দেশ্যে ঢাকা বিমানবন্দর থেকে গাজীপুর পর্যন্ত বিআরটি প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছিল। পরিকল্পনা অনুযায়ী, মহাসড়কের মাঝখানে নির্দিষ্ট লেনে বিশেষ বাস চলাচল করার কথা ছিল। এতে গাজীপুরসহ আশপাশের ১৮ জেলার মানুষের যাতায়াতের সময় কমার পাশাপাশি সড়কের পরিবহণ সক্ষমতা বাড়ার আশা করা হয়েছিল। ২০১২ সালে শুরু হওয়া প্রকল্পটি ২০১৬ সালে শেষ করার লক্ষ্য থাকলেও নির্ধারিত সময়ে তা বাস্তবায়ন করা যায়নি। বরং নির্মাণকাজের দীর্ঘসূত্রতায় ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে যানজট, যাত্রীভোগান্তি ও পরিবহণ ব্যয় বেড়েছে।

ভূমি অধিগ্রহণ, নকশা পরিবর্তন, ভূগর্ভস্থ গ্যাস ও বিদ্যুতের লাইন স্থানান্তর, পানি নিষ্কাশন সমস্যা এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতাকে প্রকল্প বাস্তবায়নে বারবার বাধা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) প্রতিবেদন অনুযায়ী, আধুনিক বিআরটি ব্যবস্থার পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো—বাসের জন্য নির্দিষ্ট লেন, আগাম ভাড়া পরিশোধের ব্যবস্থা, প্ল্যাটফর্মের সমতলে বাসে ওঠানামা, অধিক যাত্রী ধারণক্ষমতাসম্পন্ন আর্টিকুলেটেড বাস এবং ভূমি ব্যবহার ও পরিবহণব্যবস্থার সমন্বয়। মেট্রোরেলের তুলনায় কম নির্মাণ ব্যয়ে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক যাত্রী পরিবহণ করা সম্ভব হওয়ায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এ ব্যবস্থার প্রসার ঘটছে।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের এক গবেষণায় চট্টগ্রামে বিআরটি ব্যবস্থা জরুরি বলে উল্লেখ করা হয়েছিল। এ ছাড়া রাজশাহী, বগুড়া, টাঙ্গাইল, ময়মনসিংহ, কুমিল্লা ও নোয়াখালীসহ ছয়টি শহরে তাৎক্ষণিকভাবে এ ব্যবস্থা প্রয়োজন বলে গবেষণায় উঠে আসে। অদূর ভবিষ্যতে আরও ১৩টি শহরে বিআরটির প্রয়োজন হতে পারে বলেও গবেষণায় উল্লেখ করা হয়। গবেষণাটি পরিচালনার সময় ঢাকা, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জে বিআরটি প্রকল্পের কাজ চলমান থাকায় শহর তিনটিকে এর আওতার বাইরে রাখা হয়েছিল।

বিশ্বে বিআরটি ব্যবস্থার যাত্রা শুরু হয় ১৯৭৪ সালে ব্রাজিলের কুরিতিবা শহরে। গ্লোবাল বিআরটি ডেটার তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের ১৯১টি শহরে এ ব্যবস্থা চালু রয়েছে এবং প্রতিদিন প্রায় সাড়ে তিন কোটি যাত্রী এতে চলাচল করেন। প্রতিবেশী ভারতে ১৩টি শহরে প্রায় ২২৮ কিলোমিটার বিআরটি করিডোর রয়েছে, যেখানে প্রতিদিন প্রায় পাঁচ লাখ যাত্রী পরিবহণ করা হয়। চীনে প্রতিদিন প্রায় ৪৪ লাখ এবং তাইওয়ানে প্রায় সাড়ে ১৩ লাখ যাত্রী বিআরটি ব্যবহার করেন।

এদিকে ঢাকা বিমানবন্দর-গাজীপুর বিআরটি প্রকল্প বাতিল করে অবকাঠামো সাধারণ মহাসড়কে রূপান্তরের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি)। সংগঠনটির মতে, সরকার এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে খারাপ বিকল্পটি বেছে নিয়েছে। দীর্ঘ ১৪ বছর নির্মাণকাজের দুর্ভোগ সহ্য করা গাজীপুর ও উত্তরার বাসিন্দাদের প্রতিও এ সিদ্ধান্ত সুবিচার করেনি বলে দাবি করেছে তারা।

বিআইপির সাধারণ সম্পাদক পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক মু. মোসলেহ উদ্দীন হাসান এক বিবৃতিতে সিদ্ধান্তটিকে টেকসই, জ্বালানিসাশ্রয়ী ও সবার ব্যবহার উপযোগী গণপরিবহণের ইতিহাসে ‘কালো দিন’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন।

বিবৃতিতে আরও অভিযোগ করা হয়, প্রকল্প বাতিলের সিদ্ধান্ত ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহারকারী এবং দেশি-বিদেশি নির্মাণ খাতের প্রভাবশালী গোষ্ঠীর স্বার্থের পক্ষে গেছে। একই সঙ্গে এটি গাজীপুর ট্রান্সপোর্ট মাস্টার প্ল্যান এবং ঢাকার সংশোধিত কৌশলগত পরিবহণ পরিকল্পনার প্রস্তাবনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

Share the news

সর্বাধিক পঠিত

Link copied to clipboard!