Skip to main content

শাহজালালে ভিটিএস ছাড়াই চলছে শত শত গাড়ি, বাড়ছে দুর্ঘটনার আশঙ্কা

�
• 5 min • 14 views


নিজস্ব প্রতিবেদক

দেশের প্রধান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের রানওয়ে, ট্যাক্সিওয়ে ও অ্যাপ্রোন এলাকায় চলাচলকারী শত শত যানবাহনের গতিবিধি কার্যকরভাবে পর্যবেক্ষণ করা যাচ্ছে না। এসব যানবাহনে বাধ্যতামূলক ভেহিকেল ট্র্যাকিং সিস্টেম (ভিটিএস) স্থাপন না করায় বিমান ওঠানামার মতো স্পর্শকাতর এলাকায় নিরাপত্তাঝুঁকি বাড়ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

বিমানবন্দরের সংরক্ষিত এয়ারসাইড এলাকায় দেশি-বিদেশি বিভিন্ন এয়ারলাইন্স ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের গাড়ি চলাচল করে। কিন্তু এসব যানবাহনের অবস্থান, গতি ও চলাচলের পথ তাৎক্ষণিকভাবে শনাক্ত করার ব্যবস্থা কার্যকর না থাকায় বড় দুর্ঘটনার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) একাধিকবার নির্দেশনা ও সময়সীমা দিলেও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ভিটিএস স্থাপন করেনি।

এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ এটিএম নজরুল ইসলাম বলেন, এয়ারসাইড এলাকায় যানবাহন চলাচল নিয়ন্ত্রণে ভেহিকেল ট্র্যাকিং সিস্টেম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোন গাড়ি কোথায় যাচ্ছে, কত গতিতে চলছে এবং অনুমোদিত এলাকায় রয়েছে কি না—এসব তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে জানা প্রয়োজন। রানওয়ে ও ট্যাক্সিওয়ের মতো স্পর্শকাতর এলাকায় একটি যানবাহনের ভুল চলাচলও বড় দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে। তাঁর মতে, বেবিচকের নির্দেশনা বাস্তবায়নে এয়ারলাইন্সগুলোর গড়িমসি উদ্বেগজনক। দ্রুত সব যানবাহনকে কেন্দ্রীয় নজরদারির আওতায় এনে নির্দেশনা অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।

বেবিচকের সদস্য (এয়ার ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট) এয়ার কমডোর মো. নূর-ই-আলম বলেন, ভিটিএস স্থাপনের জন্য এয়ারলাইন্সগুলোকে একাধিকবার সময় দেওয়া ও তাগাদা দেওয়া হয়েছে। এবার নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ব্যবস্থা না নিলে সংশ্লিষ্ট যানবাহন এয়ারসাইডে প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না। তাঁর ভাষ্য, আধুনিক বিশ্বের বিমানবন্দরগুলোয় বহু বছর ধরে এ ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহৃত হচ্ছে। শাহজালালে এটি কার্যকর হলে এয়ারসাইডে চলাচলকারী অনুমোদিত যানবাহনগুলো কেন্দ্রীয়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হবে।

তিনি আরও জানান, কোন এয়ারলাইন্স কতটি গাড়িতে ভিটিএস স্থাপন করেছে এবং কতটি গাড়িতে এখনো বাকি রয়েছে, তা জানতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে তথ্য চাওয়া হয়েছে। তথ্য পাওয়ার পর পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে। বেবিচকের নির্দেশনা সত্ত্বেও ইউএস-বাংলা, নভোএয়ার, এয়ার অ্যাস্ট্রা, স্কাই ক্যাপিটাল এয়ারলাইন্সসহ বিভিন্ন এয়ারলাইন্স ও সংশ্লিষ্ট সংস্থার বিরুদ্ধে নির্দেশনা বাস্তবায়নে বিলম্বের অভিযোগ রয়েছে।

বেবিচক সূত্রে জানা গেছে, অ্যাপ্রোন এলাকায় উড়োজাহাজ ও অন্যান্য যানবাহনের চলাচল পর্যবেক্ষণ এবং দুর্ঘটনা এড়াতে ভিটিএস স্থাপন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এ লক্ষ্যে চলতি বছরের ১৫ জুনের মধ্যে সব যানবাহনে ট্র্যাকার বসিয়ে তালিকা জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। পরে সময়সীমা বাড়িয়ে ৩০ সেপ্টেম্বর করা হয়। কিন্তু এরপরও নির্দেশনা পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি।

পরিস্থিতি পর্যালোচনায় বেবিচকের এয়ার ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট বিভাগ থেকে গত ২৬ অক্টোবর একটি জরুরি চিঠি জারি করা হয়। চিঠিতে ২৭ অক্টোবরের মধ্যে শতভাগ যানবাহনে ভিটিএস স্থাপন করে তালিকা জমা দিতে বলা হয়েছিল। তবে সেই সময়সীমা পার হলেও কোনো উড়োজাহাজ কোম্পানি তাদের ভিটিএসযুক্ত যানবাহনের তালিকা জমা দেয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এ অবস্থায় তৃতীয় টার্মিনাল উদ্বোধনসংক্রান্ত স্টিয়ারিং কমিটির সভায় সিদ্ধান্ত হয়েছে, আগামী ৭ ডিসেম্বরের পর ভিটিএস ছাড়া কোনো যানবাহন এয়ারসাইডে চলাচলের অনুমতি পাবে না। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ট্র্যাকার স্থাপন না করার কারণে কোনো দুর্ঘটনা বা নিরাপত্তাঝুঁকি তৈরি হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে এর দায়ভার বহন করতে হবে বলেও জানানো হয়েছে।

বেবিচকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, ট্র্যাকার স্থাপন করা হলে রাডারভিত্তিক ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রতিটি যানবাহনের অবস্থান পর্যবেক্ষণ করা যাবে। কোনো গাড়ি বিপজ্জনক এলাকায় প্রবেশ করলে তাৎক্ষণিক সতর্কবার্তা দেওয়াও সম্ভব হবে। এতে নিয়ন্ত্রণ টাওয়ারের সক্ষমতা কাজে লাগিয়ে উড়োজাহাজের ওঠানামার নিরাপত্তা আরও জোরদার করা যাবে।

ভিটিএস স্থাপনে বিলম্বের বিষয়ে এয়ার অ্যাস্ট্রার হেড অব অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অ্যান্ড এয়ারলাইন সিকিউরিটি গ্রুপ ক্যাপ্টেন (অব.) এবিএম সারওয়ার জামান বলেন, বিদেশ থেকে ট্র্যাকার আমদানি করতে হচ্ছে বলে কিছুটা সময় লাগছে। তৃতীয় টার্মিনাল চালুর আগেই ভিটিএস স্থাপন করা সম্ভব হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। অন্যদিকে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স জানিয়েছে, এ-সংক্রান্ত কার্যক্রম চলমান রয়েছে এবং শিগগিরই বেবিচকের কাছে তালিকা জমা দেওয়া হবে।
আগেও ঘটেছে দুর্ঘটনা
বিমানবন্দরে যানবাহন ও উড়োজাহাজের সংঘর্ষের একাধিক ঘটনা ঘটেছে। গত বছরের নভেম্বরে শাহজালালে একটি পুশকার্টের ধাক্কায় এয়ার ইন্ডিয়ার একটি বোয়িং উড়োজাহাজের নোজ হুইল ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর ফলে ফ্লাইটটি বাতিল করতে হয়েছিল।

এর আগে ২০২২ সালে বিমানের হ্যাঙ্গারে একটি বোয়িং-৭৩৭ উড়োজাহাজ বের করার সময় সেখানে অবস্থানরত আরেকটি বোয়িং-৭৭৭ উড়োজাহাজের সঙ্গে ধাক্কা লাগে। একই বছর ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের একটি ট্রলি বিমানের একটি উড়োজাহাজে আঘাত হানে। সংশ্লিষ্টদের মতে, যানবাহনের গতিবিধি প্রযুক্তির মাধ্যমে কার্যকরভাবে পর্যবেক্ষণ করা গেলে এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা এড়ানোর সুযোগ বাড়বে।
প্রযুক্তি থাকলেও পুরোপুরি কাজে লাগছে না
বেবিচক সূত্র জানায়, শাহজালাল বিমানবন্দরে অ্যাডভান্সড সারফেস মুভমেন্ট গাইডেন্স অ্যান্ড কন্ট্রোল সিস্টেম (এ-এসএমজিসিএস) এবং ভেহিকেল ট্র্যাকিং-সংক্রান্ত প্রযুক্তি স্থাপন করা হয়েছে। এসব ব্যবস্থার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ টাওয়ার থেকে যানবাহনের অবস্থান, গতি ও চলাচলের পথ তাৎক্ষণিকভাবে পর্যবেক্ষণের সুযোগ রয়েছে।

তবে উড়োজাহাজের গ্রাউন্ড সাপোর্ট, ক্যাটারিং ও কার্গো পরিবহনে ব্যবহৃত বিভিন্ন যানবাহনে প্রয়োজনীয় ট্র্যাকার না থাকায় প্রযুক্তির পূর্ণ সুবিধা পাওয়া যাচ্ছে না। যাত্রীবাহী উড়োজাহাজে শনাক্তকরণ প্রযুক্তি সাধারণত নির্মাণের সময়ই যুক্ত থাকে। কিন্তু গাড়ি, বাস ও অন্যান্য সেবা যানবাহন শনাক্ত করতে সেগুলোতে আলাদা ট্র্যাকার স্থাপন করতে হয়।

বিমানবন্দরের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার ভাষ্য, ইতোমধ্যে শতাধিক ভেহিকেল ট্র্যাকার ও সংশ্লিষ্ট শনাক্তকরণ সরঞ্জাম সংগ্রহ করা হয়েছে। প্রয়োজন অনুযায়ী এ সংখ্যা আরও বাড়ানো সম্ভব। এখন এসব প্রযুক্তির যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং সংশ্লিষ্ট সব যানবাহনকে নজরদারির আওতায় আনাই প্রধান চ্যালেঞ্জ।

Share the news

সর্বাধিক পঠিত

Link copied to clipboard!